ভূমি ব্যবস্থাপনার দুর্বৃত্তায়িত ইতিহাস: ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ

ড. প্রশান্ত কুমার রায়

দীর্ঘকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ এবং পাকিস্তানি শোষণের পর স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানাদির দুর্বলতা। আমলাতন্ত্রও ছিল অপরিবর্তনীয়, যে কারণে ঐতিহ্যগত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা অব্যাহত থেকেছে সেখানে। এরইমধ্যে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরে রাষ্ট্রপিতাকে খুনের মাধ্যমে তার নেতৃত্ব থেকে বিযুক্ত করা হয় বাংলাদেশকে। দেশের মালিক জনগণের মতামত তোয়াক্কা না করে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শাসকেরা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা তথা রাষ্ট্রের মূলনীতি পরিবর্তন করে বাংলাদেশকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। প্রগতিমনস্ক অসাম্প্রদায়িক ও সমাজতান্ত্রিক আবহের পরিবর্তে পেছনে ফেলে আসা পাকিস্তনি মডেলের প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শকে আঁকড়ে ধরার প্রয়াস চলে। প্রতিফলে একাত্তরের ঐক্যবদ্ধ চেতনায় ঋদ্ধ এদেশের মানুষ মোটাদাগে দুটি প্রধান রাজনৈতিক ধারার দিকে ধাবিত হয়: অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক গোষ্ঠী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধি ও মৌলবাদ অভিমুখী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। এই দ্বৈত রাজনৈতিক আবহের দ্বন্ধ এদেশের মানুষকে তাদের চিন্তচেতনা ও আচরণে দেশপ্রেমিক মানসিকতা থেকে সুবিধাবাদী চরিত্রে ইন্ধন যোগায়, এবং তা আমলাতন্ত্রকেও ব্যাপক পরিসরে প্রভাবিত করে। জনপ্রশাসন জনগণের সেবকের পরিবর্তে দলের সেবক হয়ে ওঠে, অর্থাŤ জনপ্রশাসন তার অবশিষ্ট নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা হারিয়ে ফেলে, এবং রাজনীতিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা নিয়ে তারা নীতিবিগর্হিত স্বার্থ চরিতার্থ বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে।

১৭৯৩ সালে ব্রিটিশরা তাদের রাজনৈতিক ও রাজস্ব প্রশাসনকে শক্তিশালী করার জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামক আইনের মাধ্যমে ভূমির মালিকানা কৃষকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাতে জমিদারির ইজারা নিশ্চিত করে। দেশি দালাল ও ধনিক শ্রেণি, পেশাদার ও অপেশাদার জমিদাররা ব্রিটিশ শোষণযন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। রাজস্ব আদায়ের নামে এদেশের কৃষকদের ওপর শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন ও নিপীড়ন। ব্যাপক সহিংসতা, মানবাধিকারের অপব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫৭ বছর এই ধারা অব্যাহত থাকে। পাশাপাশি চলতে থাকে সামন্তবাদী জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বাধীনচেতা জনসাধারণের সর্বব্যাপী আন্দোলন সংগ্রাম। সংক্ষুব্ধ সে-সমস্ত সংগ্রামের প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব (এসএটি) আইন-১৯৫০ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু মগজ মনন আর দেশ শাসনের দর্শনে উপনিবেশের ভুত জাগরুক রাখায় পাকিস্তান সরকার মানুষের সংগ্রামলব্ধ সে আইন বাস্তবায়নে বিরত থাকে। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে বাঙালিদের (শেরে বাংলা একে ফজলুল হক) নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলে মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন কার্যকর করা হয়। জমিদারদের উচ্ছেদ করে চাষীদেরকে পুনরায় জমির মালিক করা হয়। কিন্তু সরকারের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও তার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দরুন সে আইন বাস্তবায়নের সময় বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত জমিদার শ্রেণির বংশধরগণ এবং পরগনাদার, নায়েব-গোমস্তা, তহশিলদার ও পাইক-বরকন্দাজরা, বিশেষকরে সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণি প্রকৃত চাষীদের পরিবর্তে নিজেদের নামে ভূমি বন্দোবস্ত করিয়ে নেয়। উৎকোচের কারণে তাদের সহায়তা করে ভূমি প্রশাসনের নি¤œ স্তরের কর্মকর্তা, বিশেষকরে ইউনিয়ন ও থানা রাজস্ব কর্মকর্তারা।

অথচ, প্রজাস্বত্ব আইনের মূল দর্শন ছিল, ঞযব ঞওখখঊজ রিষষ নব ঃযব ঙডঘঊজ ড়ভ ঃযব খঅঘউ অর্থাৎ ‘‘লাঙ্গল যার জমি তার।” এ আইনের শর্তানুসারে অধিগ্রহণের সময় পুনরুদ্ধারকৃত ভূমির সাথে জমিদারদের দখলে থাকা আরও অনেক অতিরিক্ত ভূমি সমর্পন করতে হয়েছিল যা ভূমিহীন চাষী ও প্রান্তিক চাষীদেরকে বিতরণ করার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সে সময়ে সামান্য পরিমাণ জমি সরকারি খাসজমি হিসাবে রেকর্ড করা হয়, এবং দেশের প্রান্তিক চাষীদের প্রকৃতঅর্থে কোন জমি বণ্টন করা হয়নি। পুনরুদ্ধার করা খাসজমি ৩ একরের কম জমি আছে এমন চাষীদের বণ্টন করার কথা ছিল, কিন্তু তা একেবারেই বাস্তবায়ন করা হয়নি। ব্যাপক সংখ্যক ভূমিহীন ও দরিদ্র চাষীকে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমি দেয়া হয়নি, ফলে জমিদারী উচ্ছেদ হয়ে তাদের ভূসম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হলেও কার্যত বিরাট এক জনগোষ্ঠী ভূমিহীন দরিদ্র হয়ে পড়ে। কারণ, কৌশলে পুনরুদ্ধার করা সবটুকু জমি স্থানীয় অভিজাত এবং দালালদের বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছিল। এবং এ কাজে তৎকালীন প্রশাসন বিশেষকরে রাজস্ব বিভাগস্থ ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তারা সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল। পরবর্তীতে আরেকটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় সামরিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের কারণে। ১৯৫৮ সালে যখন আইয়ুব খানের নেতৃত্বে মার্শাল ল সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তখন ভূমির একক অধিকারের সীমাকে ১০০ বিঘা (৩৩.৩৩ একর) থেকে ৩৭৫ বিঘায় (১২৫ একর) উন্নীত করে আইন সংশোধন করা হয়। সরকারি খাসজমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে প্রান্তিক চাষীদের পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সেই সাথে চাষীদের ভূমি প্রাপ্তির শেষ ভরসাও শেষ হয়ে যায়।

অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন-১৯৫০ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই ভূমি দুর্নীতির সর্ববিধ প্রবণতা অব্যাহত থেকেছে। সুতরাং সেই সময় নানান অনিয়মে অনুঘটকের ভূমিকা রাখায় ভূমি প্রশাসন রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের অন্যতম হিসাবে আখ্যায়িত হয়ে আসছে। তারা ঘুষের বিনিময়ে স্থানীয় ভূমি দখলকারী ব্যক্তিদেরকে সরকারি বা জনগণের সম্পত্তি দখলে সহায়তা করেছে, এবং করে আসছে। যেসব ব্যক্তি খতিয়ান তৈরিতে নিযুক্ত, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল রেকর্ড দাখিল করে ভূমির নিরপরাধ মালিককে ভুল রেকর্ড সঠিক করার অজুহাতে ঘুষ দিতে বাধ্য করে। ভূমি প্রশাসনে এরকম দুর্নীতির প্রবণতা ও চর্চা সেই সময় থেকে আজও অবধি অব্যাহত রয়েছে। দেখা গেছে, মাঝে মধ্যে দালাল, টাউট ও ভূমিদস্যুরা নিজেদের নামে অন্যের জমি রেকর্ড করার নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট জরিপকারী বা আমিন অথবা সর্দারদেরকে (প্রধান) ঘুষ দেয়। কখনও থানা রাজস্ব কর্মকর্তার (বর্তমানে এসি ল্যান্ড) সঙ্গে যোগসাজসে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (তহসিলদার) বড় অংকের ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে ভুল মিউটেশন (রেকর্ড হালনাগাদ) করে। ঢাকা শহরে এ ধরনের একেকটি অবৈধ মিউটিশনের ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন চলে।

এ সমস্ত বেআইনি ও নিয়মবহির্ভুত কর্মকা- মানুষকে, বিশেষকরে ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে আদালতে মামলা দায়ের করতে বাধ্য করে। জনপ্রশাসনের অসঙ্গত কার্যক্রমের কারণে সৃষ্ট মিথ্যা মালিকানার দরুন অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরণের মামলা সামাজিক অস্থিরতা এমনকি হত্যাকা- ঘটায়। অর্থাৎ ভূমির সমস্যা শেষপর্যন্ত ফৌজদারি অপরাধে পরিণতি পায়। বলা যায়, অবৈধ ভূমি রেকর্ড এবং ব্যবস্থাপনার মতো ঘটনা ক্রমিক অপরাধমালার জন্ম দেয়, যেমন- দেওয়ানি মামলা, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ, খুনোখুনি ইত্যাদি ফৌজদারি মামলায় পরিণতি পায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধী সাব্যস্ত হয় এবং কারাদ- বরণ করে। এতে অর্থ, সময়, সামাজিক মর্যাদা ও সংহতির অপচয় ঘটে এবং শেষপর্যন্ত তা দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত করে। বিচারের ভার যার কাছে, সেই আদালত সম্পর্কিত ব্যক্তিরাও অসৎ বিধায় বাদী বিবাদী উভয় পক্ষের আইনজীবীকে ঘুষ দিতে হয়, এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রতিনিধিদেরকে মামলার মধ্যস্থতাকারী হিসাবে (যেমন- বিচার পেতে) ঘুষ দিতে হয়। এভাবে প্রতি ঘাটে ঘুষ দিতে দিতে অনেক সময় ছাগলের জন্য মামলা করে গরু হারাতে হয় বিচার প্রত্যাশী নাগরিককে। অর্থাৎ ভূমি দুর্নীতিতে সৃষ্ট সমস্যা কেবল দরিদ্রকে আরও দরিদ্র করে না, স্বচ্ছল মানুষকেও অনেক ক্ষেত্রে সর্বশান্ত করে ফেলে, মানুষকে দারিদ্রের দুষ্টচক্রে ফেলে দেয়, এবং দেশকে তার আরাধ্য অগ্রগতির বিপরীতে নি¤œগামী করে রাখে। অবশ্য সম্প্রতি ভূমি প্রশাসনে দুর্নীতি হ্রাসে কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের মতো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের হাতে এমত জনসেবা ব্যবস্থাপনার ভার, সে ভূমি প্রশাসনকে সৎ ও সুদক্ষ করা না হলে, এবং সর্বোপরি সুশাসন নিশ্চিত করা না হলে উপনিবেশকাল থেকে জন্ম নেয়া এই অসুখ থেকেই যাবে। অর্থাৎ সাময়িক উপশম না করে যদি অসুখটাই নির্মূল করতে হয় সেক্ষেত্রে সুশাসনের নিশ্চয়তা দরকার হবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক: সাবেক সচিব ও গবেষক